নকশিকাঁথার মাঠ ০২/১৪ - জসিম উদ্দিন

এক কালা দতের কালি যা দ্যা কলম লেখি,  
 আর এক কালা চক্ষের মণি, যা দ্যা দৈনা দেখি,  
  
  
 -ও কালা, ঘরে রইতে দিলি না আমারে।  
                   -মুর্শিদা গান  
  
 এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,  
 কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!  
 কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,  
 তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া।  
 জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু,  
 গা-খানি তার শাঙন মাসের যেমন তমাল তরু।  
 বাদল-ধোয়া মেঘে কে গো মাখিয়ে দেছে তেল,  
 বিজলী মেয়ে পিছলে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল।  
 কচি ধানের তুলতে চারা হয়ত কোনো চাষী,  
 মুখে তাহার ছড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি।  
  
 কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি,  
 কালো দতের কালি দিয়েই কেতাব কোরাণ লেখি।  
 জনম কালো, মরণ কালো, কালো ভূবনময়;  
 চাষীদের ওই কালো ছেলে সব করেছে জয়।  
  
 সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার’  
 রঙ পেলে ভাই গড়তে পারি রামধণুকের হার।  
 কালোয় যে-জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,  
 তারি পদ-রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন।  
 সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনার মুখ,  
 কালো-বরণ চাষীর ছেলে জুড়ায় যেন বুক।  
 যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তার গাঁও!  
 সেই কালোতে সিনান করি উজল তাহার গাও।  
  
 আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে মানী,  
 খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি।  
 জারীর গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে,  
 “শাল-সুন্দী-বেত” যেন ও, সকল কাজেই লাগে।  
 বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও, পাগাল লোহা যেন,  
 রূপাই যেমন বাপের বেটা, কেউ দেখেছ হেন?  
 যদিও রূপা নয়কো রূপাই, রূপার চেয়ে দামী,  
 এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামী। 
  
====== 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url